মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

খেলাধূলা ও বিনোদন

খেলাধুলা

সুনামগঞ্জ বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলার মধ্যে ফুটবল, ক্রিকেট, হ্যান্ডবল, ভলিবল, এথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, টেবিল-টেনিস ইত্যাদি প্রধান। এসব খেলাধুলা প্রায় সারা বছর ধরেই অনুষ্ঠিত হয়। এ জেলায় ১৯৪৭ সালে ফুটবল ও ১৯৬৭ সালে ক্রিকেট খেলা শুরু হয়।এসব খেলাধুলার জন্য এ জেলার জেলা সদরের স্টেডিয়াম ব্যতীত কোন স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। হাওর বাওর বেষ্টিত এ জেলার খেলোয়ারগণ খেলাধুলার জন্য সাধারণত বিভিন্ন স্কুল কলেজের মাঠ ও পতিত জমি ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া খেলাধুলার জন্য ০২টি মোটামুটি মানের মাঠ রয়েছে। পুরাতন কোর্ট সংলগ্ন সুনামগঞ্জ স্টেডিয়ামটি (প্যাভিলিয়ন-গ্যালারীসহ) অবস্থিত।

বিনোদন

গান, নাটক, কবিতার বর্ণে গন্ধে শোভিত এ জনপদ হাজার বছর ধরে তাঁর বিনোদন ঐতিহ্যের ধারা বহন করে চলেছে। এ জনপদের শিল্প সংস্কৃতির ধরণ  যেমন অন্য জনপদ থেকে ভিন্ন, তা চর্চার ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করে। নাগরিক সমাজের ধাঁচে এখানে শিল্প নির্মাণ হয়না, শিল্পচর্চা ও  বিনোদন হয় জীবনকেন্দ্রিক।

এ অঞ্চলের সম্পদকে কাজে লাগাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীই শিল্প নির্মাণে উদ্যোগী হতে দেখা যায়। গ্রামীণ এলিটরা বাঁচার জন্যে সস্তা কাঁচামাল  দিয়ে শিল্প নির্মাণ করে আসছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এ জনপদ কৃষি প্রধান এবং কৃষিকে কেন্দ্র মানুষের জীবন আবর্তিত হচ্ছে। আমরা যদি জলজীবিকার কথা চিন্তা করি তাতে দেখা যাবে জনপদের ৮০ ভাগ মানুষই চাষাবাদ ও শিকারবৃত্তিকে আঁকড়ে ধরে জীবন নির্বাহ করে আসছে। এ জীবন নির্বাহের পেছনে শুধু শ্রমদান মুখ্য তা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পচর্চার বিষয়টিও। সাধারণ মানুষ কৃষি উপকরণ, মৎস্য আহরণের উপকরণগুলো এক সময় ঘরে বসে তৈরি করেছে। তন্মধ্যে লাঙ্গল, জোয়াল, ফুফা, মই, জাল, বাগুড়া, রোঙ্গা, কুচা, ফলো, আত্তর, কুইন ইত্যাদি। এখনও এ সব উপকরণ গ্রামেই তৈরি হয়। এটি আমাদের এতদঞ্চলের শিল্প। বিনোদনের জন্যে শিল্প। এ বিষয়টি গ্রামীণ জনপদে মানুষের অন্তরকে নাড়া দেয়। হাতে তৈরি রুমাল, রুমালের জমিনে আঁকা সূচিশিল্প, হাতপাখা, বেত থেকে তৈরি শীতলপাটি তাঁর বুকে তাজমহলের ছবি এখানকার মানুষের জীবন থেকে উৎসারিত শিল্প। তাতে শুধুই যে কষ্টের ছাপ পরিলক্ষিত হয় তা নয়, এর ভেতরে রয়েছে গ্রাম বাংলার নর-নারী, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিরহ-বিচ্ছেদের দলিল। একটা সময় ছিল মানুষ নিজেদের কথা মুখে না বলে শিল্পের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করত। যেমন এখনও দেয়ালে সাঁটানো সূচিকর্মে লেখা দেখা যায় ‘যাও পাখি বল তারে  সে যেন ভুলে না মোরে’ এ জনপদের শিল্প সংস্কৃতি নেহাত বিনোদন নয়, তাতে যোগ আছে জীবনের। এখানে বেত শিল্প-বাঁশ শিল্প ও কাঠ শিল্পের ছোট ছোট কারখানা ও কুটিরশিল্প  রয়েছে। চারু-কারু শিল্পে বাঁশ বেতের পাখা, কাপড়ের পাখা, ছিক্কা, এখনও এ জেলায় কিছু কিছু পাওয়া যায়। হুগলার চাটাই, বাঁশের চাটাই, মূর্তার চাটাই, বাঁশের তৈরী ডোলা, কুলা, পাইলা, কাটা, বড় ডোলা, ইত্যাদি লোকজীবনের প্রতীক। মাইজবাড়ি জলযান শিল্প এখন ইতিহাসের অংশ। বার্কী নৌকা তৈরির উদ্যোগ আজও অব্যাহত আছে। নৌকা তৈরীর উপকরণ সংকটের কারণে শিল্পীদের জীবিকা নির্বাহ করা কষ্টসাধ্য হলেও ঐতিহ্য ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর শিল্পের রুপকাররা। তবে কর্মকার, স্বর্ণকার, চর্মকাররা দীনতার কারণে শিল্পের সরসবোধ আস্বাদন করতে পারছে না যেমন ঠিক তেমনই কুম্ভকাররা মাটিজাত শিল্প মূর্তি ও মাটির বাসন-কোসন অনেক ক্ষেত্রে নিতান্তই দায়ে পড়ে তৈরি করছে।

শিল্পসংস্কৃতির আরেকটি ধারা হলো গ্রাম্যমেলা। এ জনপদে যে স্থানে মেলা হয় তন্মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর-পাইকাফনের মেলা, মাইজবাড়ীর মেলা, আলমপুরের মেলা। ছাতক-ছনখাইড়ের মেলা, পীরপুরের মেলা। দোয়ারাবাজার- মাছিমপুরের মেলা, পানাইলের মেলা। বিশ্বম্ভরপুর- রাধানগরের মেলা, ফুলবড়ির মেলা। দিরাই- ধলমেলা, মাতারগাঁয়ের মেলা, বাংলাবাজারের মেলা, সজনপুরের মেলা, রাজার গাঁওয়ের মেলা, পাঁচগাছির মেলা, কালাচাঁন ঠাকুরের মেলা, বরার গাওয়ের মেলা। তাহিরপুর- পণাতীর্থ মেলা। ধর্মপাশা- শিবরাত্রির মেলা, বারুণী মেলা। শাল্লা- সমেশ্বরীর মেলা, হুমাই ঠাকুরানীর মেলা। জগন্নাথপুর- কামারখালের মেলা, রৌওলির মেলা, মীরপুরের মেলা। জামালগঞ্জ-নোয়াগাঁয়ের মেলা, সাচনার মেলা।

চৈত্র সংক্রান্তি নবান্ন, মহরম পূর্বে লাঠিখেলা লৌকিক অনুষ্ঠান বা উৎসবের সাথে সঙ্গতি রেখে আজও গান গাওয়া হয়, কবিতা, ছড়া, পাশাপাশি লোক খেলার মধ্যে ষাঁড়ের লড়াই, নৌকা বাইচ, হাডুডু খেলা, মোরগের লড়াই, কুস্তি, লাঠিখেলা আয়োজন করা হয়। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির লৌকিক ক্রিয়া অনুষ্ঠান হলো পুঁথি পাঠের আসর। এ জেলার প্রত্যেক উপজেলাতে পুঁথি পাঠের রেওয়াজ প্রচলিত আছে। এ জনপদে চিরায়ত ঐতিহ্যের মধ্যে পুঁথি পাঠ অনাড়ম্বর প্রয়াস। তার জন্য পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না। লৌকিক প্রেমযুদ্ধ, পৌরাণিক মিথ পুঁথির উপজীব্য বিষয়। পুঁথির মধ্যে দৌলত কাজীর লাইলী মজনু(১৫৭৫) শাহ মোহাম্মদ সগীরের ইউসুফ- জুলেখা (১৩৮৯-১৪১০), মুহাম্মদ কবীরের মধুমালতী (১৭৩৯), আলাউলের পদ্মাবতী (১৬৫৯)। ইসলামিক যুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত সৈয়দ সুলতানের রসুল বিজয়, শহীদে কারবালা, ওয়াহেদ আলীর জঙ্গনামা। এ অঞ্চলে যে সকল পুঁথি পাঠ করা হয় ঐসব পুঁথি মুলতঃ লৌকিক প্রেম, ধর্মযুদ্ধ, নবীচরিত ও পৌরাণিক মিথাশ্রিত। এ অঞ্চলের সংস্কৃতি লোক ঐতিহ্য নির্ভর। এ সংস্কৃতির চর্চাকারীর বৃহৎগোষ্ঠীই বসবাস করে গ্রামে। কবি নজরুলকে যতটা জানে শহরের মানুষ তাঁর চেয়ে অনেক বেশি চিনে-জানে সৈয়দ শাহনূর, রাধারমণ, হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিমকে। গীতপ্রধান এ অঞ্চল সমগ্র দেশে স্বতন্ত্রভাবে পরিচিত শুধু লোককবি, আউল-বাউল ও পীর ফকিরদের অবদানের জন্যে। তিনশতাধিক লোককবির জন্মভিটা এ সুনামগঞ্জ জেলা। সে সাথে ধান পাথর। এখনও এ জনপদে ষাট হাজারের বেশী লোকগান পড়ে আছে। এছাড়াও এ অঞ্চলে জারী-সারি, ভাটিয়ালি, বিয়ের গান, বেদের গান, ফকিরি গান, ঘাটুগান, মালজোড়া গান, ধামাইল গান লোক ঐতিহ্যের সাঙ্গেতীক ধারা। প্রবাদ-প্রবচন, ডাকের কথা, ছিলক, কিচ্ছাকাহিনী আজও লোকমুখে শোনা যায়। উপযুক্ত ধারার অনেক লোকজ উপাদান লোকচক্ষুর অন্তরালে পড়ে আছে। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান হিসেবে প্রাচীন জমিদার বাড়ি, লাউরের ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। লোক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে শিল্পী, সাহিত্যিক, লোক কবিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এখনও পরিত্যাক্ত অবস্থায় মাঠে পড়ে আছে। যে শিল্প সংস্কৃতির উপাদান গুলো জীবন নির্বাহে ও বিনোদনে উৎস হিসেবে মানুষজনের বিবেচিত, সেসব উপাদানগুলো জেনে শুনে হারাতে রাজী নয় এ প্রজন্ম। মহান ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে শুধু ত্যাগের ইতিহাসই নয়, মুক্তিযুদ্ধ রক্তস্নাত শানিত জীবনের শিল্পবটে। যুদ্ধ জয়ের গল্প শুধুই যে  কাগজে ছেপেছে  তা নয় যুদ্ধের পটভূমি নিয়ে এখন প্রজন্মরা আঁকতে জানে ছবি। সুতরাং জীবনের জন্যে শিল্পচর্চার গুরুত্বকে খাটো করে দেখা মোটেই শোভনীয় নয়। শিল্পসংস্কৃতির নানা উপাদানকে সংরক্ষণ করার মানসে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে আগামীর পথে। কারণ ইতিহাস যদি মানুষকে কাছে টানতে না পারে মানুষ কখনোই ইতিহাস তৈরী করতে পারবে না। চোখের দেখা থেকে মনের চক্ষু খুলে যেতে পারে- এ সুবাদে আলোকিত হয়ে ওঠতে পারে এ জনপদের মানুষ, আর দেরী নয়, এখনও চোখের সামনে বা অগোচরে যা কিছুই পড়ে তুচ্ছ না ভেবে হাতে তুলে নিতে ব্রতী সবাই। ঐতিহ্য সংস্কৃতির  স্বতন্ত্র আড়ত হিসেবে শিল্প সংস্কৃতির ইতিহাস বিবেচনায়  সম্প্রতি শিল্প-সংস্কৃতি ও লোকায়ত ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার অভিপ্রায় নিয়ে যুদ্ধ জয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ খ্রি. সবার জন্য একটি স্বতন্ত্র  মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন  করায় সুধী  সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে।

ছবি


সংযুক্তি



Share with :

Facebook Twitter